আজ ১৫ আগস্ট। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৫১তম প্রয়াণ দিবস। ১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্ট বাঙালি জাতির ইতিহাসে এক কলঙ্কিত ও রক্তক্ষয়ী অধ্যায়। ধানমণ্ডির ৩২ নম্বর সড়কে ঘাতকের দল নির্মমভাবে কেড়ে নিয়েছিল বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে। সেদিন সপরিবারে রক্তে ভেসে গিয়েছিল ৩২ নম্বর বাড়ির সিঁড়ি। এই শোক শুধু একটি পরিবারের নয়, পুরো স্বাধীন বাংলাদেশের আত্মাকে ক্ষতবিক্ষত করেছিল। কবির ভাষায়, “রক্তে ভেজা ধানমণ্ডি আজ কাঁদে।”
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ছাড়াও ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট রাতে তাঁর সহধর্মিণী বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিব, তিন ছেলে শেখ কামাল, শেখ জামাল ও শিশুপুত্র শেখ রাসেল; পুত্রবধূ সুলতানা কামাল ও রোজী জামাল; শেখ মুজিবুর রহমানের একমাত্র ভাই শেখ আবু নাসের, বঙ্গবন্ধুর ফোন পেয়ে তাঁর জীবন বাঁচাতে ছুটে আসা কর্নেল জামিল, এসবির কর্মকর্তা সিদ্দিকুর রহমান ও সেনাসদস্য সৈয়দ মাহবুবুল হককে হত্যা করা হয়।
১৫ আগস্টের সেই রাতে সেনাসদস্যদের আরেকটি দল শেখ মুজিবুর রহমানের ভাগনে তৎকালীন যুবলীগের নেতা শেখ ফজলুল হক মনির বাসায় হামলা চালিয়ে তাঁকে ও তাঁর অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী আরজু মনিকে হত্যা করে। এ ছাড়া বঙ্গবন্ধুর ভগ্নিপতি আবদুর রব সেরনিয়াবাতের বাসায় হামলা করে তাঁকে ও তাঁর কন্যা বেবি, পুত্র আরিফ সেরনিয়াবাত, নাতি সুকান্ত বাবু, সেরনিয়াবাতের বড় ভাইয়ের ছেলে সজীব সেরনিয়াবাত এবং এক আত্মীয় আবদুল নঈম খানকে হত্যা করা হয়।
ওই সময় বঙ্গবন্ধুর দুই মেয়ে শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা বেলজিয়ামের ব্রাসেলসে অবস্থান করায় প্রাণে বেঁচে যান। ১৫ আগস্টের সেই হত্যাকাণ্ডের ২১ বছর পর শেখ হাসিনার নেতৃত্বে ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসে। এরপর হত্যাকারীদের বিচার শুরু হয়। একই সঙ্গে ১৫ আগস্টকে জাতীয় শোক দিবস এবং এই দিনে সরকারি ছুটি ঘোষণা করা হয়।
১৯৯৮ সালের ৮ নভেম্বর বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলায় ১৫ জনের মৃত্যুদণ্ড দেন আদালত। পরে উচ্চ আদালত ১২ আসামির মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখেন। ২০০১ সালে বিএনপির নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকার ক্ষমতায় এলে সেই সিদ্ধান্ত বাতিল করা হয়। পরে ২০০৭ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকার আবারও ১৫ আগস্টকে রাষ্ট্রীয়ভাবে জাতীয় শোক দিবস পালনের সিদ্ধান্ত নেয়।
এর পর প্রতি বছর ১৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মী ছাড়াও বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন ধানমন্ডির ৩২ নম্বরে বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতিতে, টুঙ্গিপাড়ায় তার সমাধিসৌধে এবং বনানী কবরস্থানে নিহতদের কবরে শ্রদ্ধা নিবেদন করতেন। বিভিন্ন ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে বিশেষ প্রার্থনা, মিলাদ ও অন্যান্য কর্মসূচিও অনুষ্ঠিত হতো।
তবে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর অন্তর্র্বতী সরকার ১৫ আগস্ট জাতীয় শোক দিবস হিসেবে পালন এবং এ উপলক্ষে সরকারি ছুটি বাতিল করে। ধানমন্ডির ৩২ নম্বরের বাড়িটি ভেঙে ফেলা হয়। ফলে পরবর্তী সময়ে সেখানে আগের মতো আনুষ্ঠানিকভাবে শ্রদ্ধা জানানোর সুযোগ থাকেনি। বর্তমানে বাড়িটির স্থানটি ভাঙাচোরা অবস্থায় পড়ে রয়েছে।
বন্ধ করা হয় শোক জানানোর কর্মসূচি। ধানমন্ডির ৩২ নম্বরের বাড়ি ভেঙে দেওয়ার পর থেকে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনগুলো সেখানে শ্রদ্ধা জানানোর সুযোগ হারায়। হাসিনা-পরবর্তী অন্তর্র্বতী সরকারের পর বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর এখন পর্যন্ত ৩২ নম্বরের বাড়িটি ভাঙাচোরা অবস্থায় পড়ে আছে।
প্রসঙ্গত, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ ও তার নেতাদের বিচারকার্য সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত আওয়ামী লীগ, সহযোগী ও অঙ্গ সংগঠনগুলোর সব ধরনের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করা হয়েছে। সন্ত্রাসবিরোধী আইনে গত বছর ১০ মে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করে তৎকালীন অন্তর্র্বতী সরকার। গত বছর ২৩ অক্টোবর আওয়ামী লীগের ছাত্রসংগঠন ছাত্রলীগকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়।
গত বছর ১৪ আগস্ট আওয়ামী লীগের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে ১৫ আগস্ট উপলক্ষে শোক জানানো হয়েছিল। এ বছরও আওয়ামী লীগের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে শোক জানানো হয়েছে।











